× home হোম archive আগের ওয়েব সংখ্যা panorama ডুয়ার্স সম্পর্কে play_circle_filled ভিডিও file_download মুদ্রিত সংখ্যার পিডিএফ library_books আমাদের বইপত্র
people এখন ডুয়ার্স সম্পর্কে article শর্তাবলী security গোপনীয়তা নীতি local_shipping কুরিয়ার পদ্ধতি keyboard_return বাতিল/ফেরত পদ্ধতি dialpad যোগাযোগ
login লগইন
menu
ad01112021105517.jpg

বালি মাফিয়ারাজ আর লাগামহীন মাইনিংয়ের দাপটে ডুয়ার্সের নদীগুলি আজ অভিশাপ

Sand Mafia Raj in Dooars

চিকেন নেক পেরিয়ে পাহাড় ঘেঁষা বিস্তীর্ণ সবুজ শান্ত জনপদটা শহুরে পর্যটকদের ভাষায় 'এক্কেবারে ওয়াও'! চা বাগান রয়েছে। রয়েছে বন! হাত বাড়ালেই পাহাড়। হোক না পাহাড়ের বেশিরভাগটাই ভুটানের। ভুটান বন্ধু রাষ্ট্র তো! চাইলেই বিনে পাসপোর্টে কিছুটা জায়গা বেড়িয়ে আসা যায়। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার যুগে কম বাজেটের বাংলা সিনেমার প্রযোজক, পরিচালকরা ঘাঁটি গাড়তেন ডুয়ার্সে। আজও পত্র পত্রিকার পাতায় পাতায় ডুয়ার্স নিয়ে গল্প, ডুয়ার্স নিয়ে কবিতা! সান্ধ্য সাহিত্য বাসরে ডুয়ার্স নিয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গদগদ কচকচানি! তবে মৌসুমীর আগমনী বার্তায় যখন বৃষ্টিস্নাত হতে কোমর বাঁধে গোটা বাংলা, অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যায় ডুয়ার্স। 'ফের হড়পা আসবে'! 'আমার বাড়িটা, দোকানঘরটা থাকবে তো'! 'ছেলেটার স্কুলে যাওয়া কত দিন বন্ধ থাকবে কে জানে'! 'আলিপুরদুয়ার শহর থেকে আবার সেই ঘুরপথে শিলিগুড়ি যাতায়াত'! 

উন্নয়নের কৃতিত্ব নিয়ে কাঁটাছেড়ার গিনিপিগ বিস্তীর্ণ এই সবুজ ভূমিটায় অমন আশঙ্কাগুলির প্রতিটি একেকজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতালব্ধ। ১৯৯৩ সালের বন্যার কথা বাদ দিলাম। ওটা না হয় 'মহা বিপর্যয়' ছিল! কিন্তু তারপরও পাড়াগাঁ, চা বাগানের কথাও বাদ দিয়ে কেবলমাত্র জেলা সদরের কথাই যদি ধরা যায়, বানভাসি হওয়াই ডুয়ার্সের শহুরেদেরও ভবিতব্য। সেতু ভাঙছে। জনপদ দিনের পর দিন ডুবে থাকছে। ভুটানের বালি, ডলোমাইটের আস্তরণ ঢেকে নিচ্ছে ডুয়ার্সের কৃষিজমি, চা বাগান। ছোট বড় মিলিয়ে ভুটান থেকে ডুয়ার্সে ঢুকেছে কমবেশি ৭০টি নদী এবং ঝোরা। এগুলির প্রত্যেকটি ডুয়ার্সের সৌন্দর্য বাড়াতে এক একটি অলঙ্কার। তবে মানুষের কার্যকলাপে ডুয়ার্সের নদী এবং ঝোরাগুলি এখন আতঙ্কের আরেক নাম।

পাহাড় থেকে রাশি রাশি বালি বজরি ভেসে জমা হয় ডুয়ার্সের নদী ঝোরার বুকে। বালি বজরি বেচে রাজস্ব আদায় করে সরকার। আবার নদীর সুরক্ষাতেও অর্থাৎ নাব্যতা ধরে রাখার জন্য বালি তোলা প্রয়োজন। এভাবেই গাড়িচালক, দিনমজুরদের রুজির সংস্থান হয়। বালি বজরি তুলতে ম্যানুয়াল মাইনিং বাধ্যতামূলক। মানুষের কর্মসংস্থান ও নদীর সুরক্ষায় বালি তোলার জন্য শুধু কোদাল, ঝুড়ি বা শ্রমিক ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। কোনোভাবেই আর্থমুভার বা পকলিনের মতো ভারি যান্ত্রিক যান ব্যবহারের অনুমতি আইনি লিজ বা ইজারার শর্তে থাকে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! রাজস্ব তো পর্বতের মুষিক প্রসবের মতো। রাজস্বের চেয়ে বহুগুণ কালো টাকা ওড়ে বালি মাফিয়াদের 'সৌজন্যে'। কিছুদিন হল সরকার পরিবর্তনের ঠেলায় সেই মাফিয়ারাজে আপাত রাশ পড়েছে ঠিকই তবে এতদিন বছরের পর বছর বুক চিতিয়ে বালি মাফিয়ারা আর্থমুভার দিয়ে বালি তুলেছে। নদীর বুকে এবড়ো-খেবড়ো গর্ত। নদী এখন পথ করে নেয় আপন খেয়ালে। চওড়া হচ্ছে ডুয়ার্সের পাহাড়ি নদীগুলি। চওড়া হতে হতে ঝোরাগুলিও এখন নদীর আকার নিয়েছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে চা বাগানের হেক্টরের পর হেক্টর প্ল্যান্টেশন এলাকা। 

কুমারগ্রামে তো ২০২১ সালে বালি মাফিয়ারা বালি তোলার জন্য সংকোশ নদীর গতিপথই পরিবর্তন করে দিয়েছিল। নদীর বুকে আলাদা একটা বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। নদী ছুটে যাচ্ছিল অন্য পথে। শেষ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যম সক্রিয় হওয়ায় নিমরাজি হয়ে পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন। তবে মাফিয়াদের এতটাই দাপট যে মাইক লাগিয়ে পথসভা করে সাংবাদিককে ভয় দেখাচ্ছিলেন ওরা। কেউ ওদের টিকি ছুঁতে পারেনি। ছোঁবে কোন সাহসে! কালচিনি কুমারগ্রাম মাদারিহাট, বীরপাড়া, সোনাপুর, তপসিখাতা, কালজানি ঘাট, নাওথোয়াটারি, ভোলারঘাট, শীলতোর্ষা বুড়িতোর্ষা - সব এলাকার মাফিয়াদের ওপর এতদিন ছিল অনেক বড় হাত। হাতটা এতটাই লম্বা যে বছর পাঁচেক আগে শিলতোর্ষা নদীতে বালি চুরি আটকাতে গিয়ে ঘোর বিপাকে পড়েছিলেন আলিপুরদুয়ারের অতিরিক্ত জেলাশাসক। তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের মারধরও করে বালি মাফিয়ার লোকজন। গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বীরপাড়া এবং বানারহাটের সীমানা বরাবর রেতি নদী লুঠ হয়েছে বছরের পর বছর। এর জেরে রেতি নদী আজও গ্রাস করে চলেছে রেতি ফরেস্টের ভূমি। হারিয়ে গিয়েছে হাজার হাজার গাছ। রেতিতে দিবালোকে তোলা আদায় করে বালি পাচারে ছাড়পত্র দিত তোলাবাজরা। তোলা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রাণ হারাতে হয় ট্রাকচালককে। আর লঙ্কাপাড়ার মাটি বারে বারে ভিজেছে বালি অবৈধ খাদানের দখল নিয়ে লড়া একের পর এক মাফিয়ার রক্তে। 

ফলে ডুয়ার্সের নদী এখন বিদ্রোহী। গ্যারগান্ডা নদীতে কোনকালেই বালি তোলার অনুমতি ছিল না কিন্তু চিরকাল তোলা হয়েছে। ২০১৫ সালে হঠাৎ জাতীয় সড়কে গ্যারগান্ডা সড়কসেতুর অ্যাপ্রোচ রোড ভাঙল। ৩ দিন যোগাযোগ বন্ধ থাকল। তবু প্রশাসনের আক্কেল হল না। বালি লুঠ বন্ধ হল না। রেলসেতু, সড়কসেতুর ২০০ মিটারের মধ্যে বালি তোলা নিষিদ্ধ। তবে ওসব তো কাগুজে আইন। লুঠ চলল গ্যারগান্ডার বুকে। এরপর প্রকৃতি বড় আঘাতটা দিল ২০২৫ সালের ৩১ মে। গ্যারগান্ডা সড়কসেতুর অ্যাপ্রোচ রোড ভাঙল (উপরের ছবি দ্রষ্টব্য)। সেতুর একটা খুঁটি বসে গেল। হেলে গেল সেতুটা। এরপর টানা সাত মাস সিঙ্গল লাইনে যান চলাচল! এশিয়ান হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার তাবড় তাবড় ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাম ছুটল। সাত মাস পর জোড়াতাপ্পি দিয়ে সেতুটা মেরামত করা হল। তবে সেতুটা আর আগের শক্তি ফিরে পেল না। কারণ নদীটা বালি তোলার জেরে অনেকটা পশ্চিমদিকে সরে গিয়েছিল। খুঁটিতে কোনাকুনি ধাক্কা মারছিল জলস্রোত। খুঁটির তলায় তৈরি হয়েছিল বিরাট গর্ত। চীন ভারত যুদ্ধের পর তৈরি করা হয়েছিল রাস্তা এবং ওই সেতুটি। এবার কয়েক কোটি টাকায় নতুন সেতু তৈরির পরিকল্পনা। এ যেন মাফিয়াদের প্রতি নৈবেদ্য অর্পণ। কিছুদিন আগে বালি বোঝাই ডাম্পার সহ ফালাকাটা ব্লকে মুজনাই নদীর বঙ্কিমের ঘাটে পাকা সেতুটাই ভেঙে পড়ল। 

নদী এবং ঝোরা শাসনে ভারত ভুটান নদী কমিশন গড়ার আলোচনা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু বালি মাফিয়াদেরই আজ পর্যন্ত শাসন করতে পারল না প্রশাসন। সরকার পাল্টে গিয়েছে। খোলস পাল্টাতে মরিয়া বালি মাফিয়ারাও। প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিচ্ছে। ফালাকাটা আলিপুরদুয়ার সলসলাবাড়ি ফোর লেনের সড়ক তৈরি হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। যুবরা প্রৌঢ় হলেন। প্রৌঢ়রা বৃদ্ধ। অনেকেই ইহলোকের মায়া কাটালেন। সড়কের কাজ শেষ হওয়ার এখনও ঢের বাকি। ওই রাস্তায় এতদিন ধরে কাঠের সিঙ্গল সেতু ছিল। ২০১৭ সালে চরতোর্ষার সেতুটা ভেসে গেল। পরে অবশ্য ফোরলেন রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হল। শুরু হল সেতু পুনর্নির্মাণের কাজ। ২০১৯ সালে শিলান্যাস ও কাজ  শুরু। এখনও দোলং, চরতোর্ষা, গিরিয়া, বালাডাঙ্গির সেতু অর্ধসমাপ্ত। বৃষ্টি হলেই ডুবছে চরতোর্ষা ডাইভারশন। জুন মাসেও ডুবেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে জেলা সদর আলিপুরদুয়ার। দোলং সেতু পরিত্যক্ত। কিন্তু ডাইভারশন জলে ডুবলে পরিত্যক্ত বিপজ্জনক সেতুর মুখ খুলে দিয়ে মানুষকে যাতায়াতের অনুমতি দিতে বাধ্য হচ্ছে প্রশাসন। 

বীরপাড়ার ভুটান সীমান্তের জয়বীরপাড়া, ঢেকলাপাড়া, বান্দাপানি চা বাগানে যাওয়ার রাস্তায় ডিমডিমা, ধুমচিখোলা নদীতে সেতু নেই। রয়েছে নাকের বদলে নরুণ কজওয়ে। বৃষ্টি হলে ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার। মাঝে মাঝে মানুষের খানিকটা ভেসে যাওয়া। ভারি বৃষ্টি হলেই বানভাসি কুমারগ্রামের জয়দেবপুরটাপু, ধনতলিটাপু। চা বাগানে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা নালার জলে ঢোবাই ভবিতব্য উত্তর হলদিবাড়ি, মধ্য হলদিবাড়ির। ভুটান পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই ঢোবে সীমান্ত শহর জয়গাঁর তালাবস্তি, ভুটানগেট লাগোয়া হনুমান মন্দির, মহাত্মা গান্ধী রোড, এনএস রোড, গুয়াবাড়ি, দারাগাঁও, সুভাষপল্লী, নিউ সুভাষপল্লী। এবছরের জুন মাসে বৃষ্টির জেরে ডাইভারশন ভেঙেছে জয়গাঁ জিএসটি মোড়ে ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়ের গোবরজ্যোতি নদীর ডাইভারশন। বৃষ্টির জলে ডুবছে হ্যামিলটনগঞ্জ, কালচিনিও। 

দায়ি পড়শী দেশ ভুটানও। ওদেশে লাগামছাড়া ভাবে মাইনিং চলছে। পাহাড় ফাটিয়ে বের করা হচ্ছে ডলোমাইট। বালি বজরি জমা হচ্ছে ভারতে, নদী, ঝোরার বুকে। আবার সব ঝোরা, নদী বুক থেকে বালি তোলাও সম্ভব নয়। মাফিয়াদের কাজ কেবল নির্দিষ্ট এলাকায়। আবার সব নদী ঝরা থেকে বালি তোলার অনুমতিও দেয় না প্রশাসন। দেওয়া সম্ভবও নয়। ফলে নদীর বুকে চড়া পড়ছে। নাব্যতা কমায় অল্পেই প্লাবিত হচ্ছে নদী। ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। চড়া জেগে ওঠায় ইচ্ছেমতো গতিপথ তৈরি করে নিচ্ছে নদী, ঝোরা। এভাবেই জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজারে মাল নদী, নাগরাকাটায় ডায়না, কুচি ডায়না, গাটিয়া নদীর হড়পায় প্রতি বছর তছনছ হচ্ছে জনবসতি। বানারহাটে হাতিনালা এখন আতঙ্কের আরেক নাম। অবশ্য হাতিনালার ধারে কাছে লাগামছাড়াভাবে জনবসতি গড়ে ওঠাও বিপর্যয়ের আরেকটা কারণ। 

তবু ডুয়ার্স আজও স্বপ্ন দেখে ভারত ভুটান নদী কমিশনের। স্বপ্ন দেখে নদী শাসনের! স্বপ্ন দেখে মাফিয়ারাজ নিশ্চিহ্ন হওয়ার। তবে বড় অসহায় ডুয়ার্সবাসী। জনপদটার সাংস্কৃতিক সত্তা লেখক, গবেষকদের বিহারের জায়গা হলেও ডুয়ার্সবাসীর হৃদয় হয়তো আজও ছুঁতে পারেননি ওপরতলার ক্ষমতাবান বাবুরা। তাই উপলব্ধি করতে পারেননি 'মিনি ইন্ডিয়া' ডুয়ার্সে অবকাশ কাটানো আর জীবনযুদ্ধের ফারাকটা! চা বাগান তাই আজও শুধুই 'ভোট বাগান'।

করোনা কালের প্রতিবেদন ফ্রি রিডিং

Disclaimer: Few pictures in this web magazine may be used from internet. We convey our sincere gratitude towards them. Information and comments in this magazine are provided by the writer/s, the Publisher/Editor assumes no responsibility or liability for comments, remarks, errors or omissions in the content.
Copyright © 2026. All rights reserved by www.EkhonDooars.com

Design & Developed by: WikiIND

Maintained by: Ekhon Dooars Team